হাইপারলুপ কি? হাইপারলুপ ও ভার্জিন গ্রুপের চুক্তি। What is HYPERLOOP?

হাইপারলুপ / Hyperloop শব্দটির সাথে পুরো বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেয় ২০ শতকের ধনকুবের এলন মাক্স, যিনি একাধারে Tesla, SpaecX, HyperLoop, OpenAI, The Boring Company এর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী এবং একসময় Paypal এর বোর্ড মেম্বার ছিলেন।

এই হাইপারলুপ / Hyperloop হচ্ছে উচ্চ গতি সম্পন্ন ট্রেন ভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা যা হবে শতভাগ তাপ, চাপ, ঘর্ষণ নিয়ন্ত্রিত এর সুরঙ্গ ব্যবহার করে। এই ব্যবস্থাটি এলন মাস্ক পরিকল্পনা করেছিলেন ২০১৩ সালে এবং যার প্রথমিক মোট ব্যায় ধরা হয়েছিল প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

Hyperloop প্রযুক্তি চুম্বকের বিকর্ষণ ধর্মের এক অসাধারণ এবং অত্যাধুনিক রূপ। যেখানে আমরা সবাই চুম্বকের উত্তর-উত্তর এক সাথে করে একটি চুম্বকে দিয়ে অন্য চুম্বকে তাড়া করেছি, সেখানে Elon Musk সেই প্রাইমারি সাইন্সকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব পরিবর্তনকারী প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ফেলেছে৷ যা আমাদের অদূর ভবিষ্যতে যাতায়াতের সময়, খরচ, কষ্ট লাঘব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

হাইপারলুপ কি?

হাইপারলুপ হলো উচ্চগতিসম্পন্ন যাতায়াত ব্যবস্থা যা প্রতি ১৫ সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। হাইপারলুপ স্যামসাং সিস্কো থেকে নিউ মেক্সিকোতে মাত্র 26 মিনিটে পৌঁছে দিতে পারবে তার যাত্রীদের।

হাইপারলুপ ধারণাটি আসে মূলত চুম্বকের বিকর্ষণ  ধর্ম থেকে। আমরা জানি চুম্বকের দুই মেরু রয়েছে একটি উত্তর এবং অপরটির দক্ষিণ। যদি দুটি চুম্বকের একই মেরু পাশাপাশি রাখা হয় তবে চুম্বক দুটি একে অপরকে বিকর্ষণ করবে এবং যদি বিপরীত মেরুর পাশাপাশি রাখা হয় তবে চুম্বক দুটি একে অপরকে আকর্ষণ করবে। এই বিকর্ষণ ধর্মের মধ্য থেকেই হাইপারলুপ ধারণাটির জন্ম।

যে কোন বস্তু রাস্তায় চলাচল করতে পারে ঘর্ষণ বলের কারণে। ঘর্ষণ বল বস্তুর গতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং রাস্তায়ও বস্তুটিকে পিছলে যাওয়া থেকে আটকায় এতে করে সাবধানে যাতায়াত করা যায়। যদি কোনো কারনে রাস্তা এবং গাড়ির মধ্যকার ঘর্ষণ কমে যায় তাহলে গাড়ির মার্ত ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এলন মাস্ক কম ঘর্ষণে কিভাবে নিরাপদে গাড়ি চালানো যেতে পারে সেই ব্যাপারে একটি উদ্যোগ নেয় এবং এর নাম দেয় হাইপারলুপ টানেল বা হাইপারলুপ যাতায়াত ব্যবস্থা।

এই যাতায়াত মাধ্যমে একটি চ্যানেলের মধ্য দিয়ে ট্রেন আকৃতির একটি বাহন চালানো হয়। টানেলের পাদদেশে কিছু শক্তিশালী চুম্বক থাকে এবং ট্রেনটিতে শক্তিশালী চুম্বক থাকে। এবং উভয় চুম্বকের একই প্রান্ত একদিকে থাকে। এতে করে চুম্বকের মাঝে বিকর্ষণ বলের কারণে ট্রেনটি মাটি থেকে খানিকটা উপরে হাওয়ায় ভাসতে থাকে, এতে করে ঘর্ষণ বল অনেক কমে যায় এর ফলে কম শক্তি ব্যায় করে অধিক দূরত্ব খুব অল্প সময়ে অতিক্রম করতে সক্ষম হবে। এই ব্যবস্থাটি নভেম্বর ২০২০ এ তাদের পরীক্ষামূলক চলাচলে সফল হয়েছে এবং ২ জন আরোহীকে বিনা সমস্যায় নেভাডা মরুভূমি থেকে গন্তব্যে নিয়ে গেছে৷

হাইপারলুপ কোম্পানি মহাকাশ যান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Virgin এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে একত্রে কাজ করছে এবং বর্তমানে হাইপারলুপ এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় Virgin Hyperloop

হাইপারলুপ যাতায়াতের সুবিধা

চুম্বক শক্তি ভিত্তিক যাতায়াত মাধ্যম হাইপারলুপের যাতায়াতের প্রচুর সুবিধা রয়েছে যা কিনা আজ থেকে 10 বছর আগেও চিন্তা করা সম্ভব ছিল না। কারন তখন কেউ চিন্তাই করতে পারত না যে কোনো ট্রেন ৭৪০ মাইল প্রতি ঘন্টা গতিবেগে ছুটতে পারে। তাই Elon Musk যখন এই প্রযুক্তি নিয়ে সবার সামনে হাজির হন তখন সবাই তাকে নিয়ে মজা করে কিন্তু এলন মাস্ক সেই তিরস্কারের উত্তর ২০২০ সালের নভেম্বরে হাইপারলুপের সফল Test Drive এর মাধ্যমে দিয়েছেন।

হাইপারলুপ প্রযুক্তির কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে যা কিনা ভবিষ্যৎ পাল্টে দিবে।

প্রযুক্তির উন্নতিঃ বর্তমানে হাইপারলুপ প্রযুক্তিকে ব্যবহারযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য সহস্রাধিক বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদ কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের প্রতিনিয়ত গবেষণার ফলে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখা উন্মোচিত হচ্ছে এবং নতুন নতুন ধারণা আবিষ্কার হচ্ছে। এতে করে দেখা যাবে এক সময় রাস্তায় চলাচলের উপযোগী ঘর্ষণ  বিহীন প্রতি দ্রুতগামী যানবাহন আবিষ্কার হওয়া থাকবে। বলা যেতে পারে হাইপারলুপ আবিষ্কার ঘটাতে পারে প্রযুক্তি এক নতুন বিপ্লব।

দূরত্ব ও সময়ঃ হাইপারলুপ ট্রেন প্রতি ঘন্টায় 7 মাইল বেগে চলাফেরা করতে পারে। যা কিনা একটি বোমারু বিমান থেকেও অনেক দ্রুত চলতে পারে। এর ফলে যাতায়াতের সময় অনেক কমে যাবে এবং অল্প সময়ে অধিক গুরুত্ব অতিক্রম করা যাবে। যেহেতু এই হাইপারলুপ প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষার ধাপে রয়েছে, তাই এটি নিয়ে খুব বেশি ভবিষ্যৎবানী করা সম্ভব হচ্ছে না। যদি এটি তার সকল পরীক্ষা ধাপ অতিক্রম করতে পারে তবে অনায়াসে এটি পুরো বিশ্ব দাপিয়ে বেডাবে। তখন বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার দূরত্ব হয়ে যাবে কয়েক ঘন্টার যেখানে এখন বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা যেতে প্রায় এক দিন সময় লেগে যাচ্ছে।

হাইপারলুপ যাতায়াতের অসুবিধা

বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কার মানব জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। সেই সাথে প্রতিটা আবিষ্কারের কিছু অসুবিধা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ আমরা যদি দেখি, পারমাণবিক শক্তি আবিষ্কার করা হয়েছিল বিদ্যুৎ শক্তির ঘাটতি মেটাতে এবং নানা ধরনের মৌলের চাহিদা মেটাতে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই পারমাণবিক শক্তির সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন বর্তমানে প্রায় প্রতিটি দেশই যাচ্ছে তাদেরকে পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ করে তুলতে হয়। যার ফলশ্রুতিতে জাতিসংঘের একটি অঙ্গ সংগঠন গড়ে উঠেছে যার নাম পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ সংগঠন, এই সংগঠনে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও আমেরিকা এই সংগঠনের বাইরে রয়ে গিয়েছে। এতে করে পারমাণবিক অস্ত্র পিন দেশগুলো চরম ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।

তেমনি হাইপারলুপ প্রযুক্তির কিছু অসুবিধা রয়েছে।

খরচঃ হাইপারলুপ প্রযুক্তিটি নতুন এবং ভ্রমণে সময় বাচাবে তাই স্বাভাবিকভাবেই এর খরচ অন্য সকল ভ্রমন যান যেমন ঃ উড়োজাহাজ, ট্রেন, বাস থেকে অনেকাংশে বেশি হবে। যেখানে একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ঘন্টায় ১০০-২০০ মাইল বেগে চলে সেখানে এই হাইপারলুপ ট্রেন ঘন্টায় ৭০০ মাইল বেগে চলবে। সুতরাং আপনার সময় প্রায় ৩ গুন কম লাগবে৷ তাই এই খরচ খুবই যুক্তিযুক্ত, আর প্রযুক্তি নতুন তাই এর পেছনে সকল ইনভেস্ট উঠিয়ে আনতে এর খরচ আরো বেড়ে যাবে।

তাই এই হাইপারলুপ ট্রেন চালু হলেও তা সকলের সাধ্যের মধ্যে থাকবে না।

যথাযথ অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণঃ হাইপারলুপ এমন এক যাতায়াত ব্যবস্থা যা ১০০% তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ দরকার হয়। হাইপারলুপের ট্রেনটি একটি স্পেশাল ক্যাপ্সুলের মতো টানেলে চালাতে হয়। তাই সবসময় এই ক্যাপসুলের পরিবেশ যথাযথ রাখা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। সেই সাথে হাইপারলুপ ট্রেন স্থল ভাগের উপর দিয়ে চলতে পারর কিন্তু তা পানির মধ্যে কেমন চলতে পারে তা এখনো পরীক্ষা হয় নি।

তাই হাইপারলুপে করে এখনি পুরো বিশ্ব ঘুরতে পারা যাবে না। হয়তে এর জন্য আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।

মানব অঙ্গে ক্ষতিকর প্রভাবঃ হাইপারলুপের টানেলে রয়েছে খুব শক্তিশালী চুম্বক ক্ষেত্র। তাই অবেক বিজ্ঞানী ধারণা করছে যাদের হার্টে সমস্যা কিংবা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত, তাদের এ যান চলাচলে বাড়তি সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।

সেই সাথে যতক্ষন না Virgin Hyperloop প্রমাণ করতে পারছে তাদের যান সকল বয়েসের সকল ধরনের সুস্থ-অসুস্থ মানুষের জন্য উপযোগী ততক্ষন এই যানে চলাচল না করাই শ্রেয়।

 

যতদূর জানা যাচ্ছে Virgin Hyperloop ২০২২ সালের দিকে তাদের পরিবহন ব্যবসায়ীক সেবা চালু করতে পারে যেমন করেছে Elon Musk এর মহাকাশ প্রতিষ্ঠান SpaceX . যদি হাইপারলুপ সফল হয় তাহলে ভ্রমণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।

Disclaimer: আমার এই ব্লগ পোস্টের বিভিন্ন তথ্য দৈনিক পত্রিকা, উইকিপিডিয়া থেকে সংগ্রহ করা।